আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে রোগ এবং সুস্থতার সংজ্ঞা অত্যন্ত বিজ্ঞানসম্মত ও গভীর। আয়ুর্বেদ অনুযায়ী, কেবল লক্ষণ প্রকাশ পাওয়াই রোগ নয়, বরং শরীরে শক্তির ভারসাম্য নষ্ট হওয়াই হলো রোগ।
ঋষি
সুশ্রুত সুস্থ মানুষের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেছেন—যার শরীরের তিন দোষ (বাত, পিত্ত, কফ), জঠরাগ্নি, শরীরের সপ্তধাতু এবং মল
নিষ্কাশন প্রক্রিয়া স্বাভাবিক থাকে, এবং যার মন, আত্মা ও ইন্দ্রিয় প্রসন্ন (আনন্দিত) থাকে, তাকেই প্রকৃত 'সুস্থ' বা 'স্বস্থ' বলা হয়। এর ব্যতিক্রম হওয়াই
হলো রোগ।
নিচে
রোগ ও রোগের কারণসমূহ আয়ুর্বেদীয় দৃষ্টিকোণ থেকে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১.
রোগের মূল স্বরূপ (Definition of Disease)
আয়ুর্বেদে
রোগকে বলা হয় "ব্যাধি"। এর মূল স্বরূপ হলো:
"তদ্ দুঃখ সংযোগা ব্যাধয়ো উচ্যন্তে॥" (সুশ্রুত সংহিতা)
অর্থাৎ, যা শরীর ও মনকে দুঃখ বা কষ্ট
দেয়,
তাই ব্যাধি।
সহজ
কথায়,
শরীরের তিন দোষ
(বাত,
পিত্ত, কফ) যখন নিজ নিজ স্থান ও
পরিমাণের ভারসাম্যে থাকে, তাকে "আরোগ্য" বা স্বাস্থ্য বলে। আর এই তিন
দোষের মধ্যে বিষমতা বা ভারসাম্যহীনতা তৈরি হওয়াকেই "রোগ" বলা হয়।
২.
রোগের প্রধান তিনটি কারণ (Three Primary Causes of Disease)
চরক
সংহিতায় মানুষের সমস্ত শারীরিক ও মানসিক রোগের পেছনে প্রধানত ৩টি মৌলিক কারণ
নিদ্দেশ করা হয়েছে:
ক)
অসাত্ম্যেন্দ্রিয়ার্থ সংযোগ (Improper Use of Senses)
আমাদের
৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয় (চোখ, কান, নাক, জিভ, ত্বক) যখন তাদের বিষয়ের সাথে
অতিরিক্ত,
কম বা ভুলভাবে
যুক্ত হয়, তখন
রোগ সৃষ্টি হয়। এর ৩টি রূপ আছে:
- অতিযোগ (Overuse): কড়া রোদে বা কম্পিউটারের
স্ক্রিনের দিকে একটানা তাকিয়ে থাকা (চোখের অতিযোগ), অতিরিক্ত জোরে গান শোনা
(কানের অতিযোগ)।
- অহীনযোগ (Underuse/No-use): সারাদিন অন্ধকার ঘরে বসে
থাকা বা ইন্দ্রিয়গুলোকে একদম ব্যবহার না করা।
- মিথ্যাযোগ (Wrong
use): খুব অন্ধকার বা আবছা আলোয় পড়ালেখা করা, অত্যন্ত তীব্র ঝাঁঝালো বা
বিষাক্ত গন্ধ নেওয়া।
খ)
প্রজ্ঞাপরাধ (Intellectual Blasphemy / Crimes against Wisdom)
সহজ
কথায়—জেনেবুঝেও ভুল করা। আমাদের
বুদ্ধি,
ধৈর্য বা
স্মৃতিশক্তি যখন লোপ পায় এবং মন জেনেবুঝেও ক্ষতিকর কাজে লিপ্ত হয়, তাকে প্রজ্ঞাপরাধ বলে।
আয়ুর্বেদে একে সমস্ত রোগের মূল কারণ বলা হয়েছে।
- উদাহরণ:
জাঙ্ক
ফুড বা অতিরিক্ত তেল-মশলাযুক্ত খাবার খেলে শরীর খারাপ হবে জেনেও তা খাওয়া, রাতের পর রাত জেগে থাকা, বেগ ধারণ করা (মল, মূত্র, হাঁচি বা খিদের বেগ জোর
করে চেপে রাখা), এবং অতিরিক্ত রাগ বা হিংসা করা।
গ)
পরিণাম বা কাল (Parinama / Effect of Time and Season)
এখানে
'কাল' বলতে ঋতু পরিবর্তন, আবহাওয়া এবং মানুষের বয়সকে
বোঝানো হয়েছে। প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী ঋতু পরিবর্তনের সাথে সাথে শরীরে দোষের সঞ্চয়
ও প্রকোপ ঘটে।
- উদাহরণ:
বর্ষাকালে
প্রাকৃতিকভাবেই বাত বাড়ে, শরৎকালে পিত্ত বাড়ে এবং বসন্তকালে কফ বাড়ে। এই
সময়ে প্রকৃতির সাথে তাল মিলিয়ে জীবনযাত্রা ও আহার পরিবর্তন না করলে কাল বা
সময়ের প্রভাবে রোগ দেখা দেয়।
৩.
রোগ সৃষ্টির অভ্যন্তরীণ প্রক্রিয়া: 'আম' (Ama / Toxins)
বাইরের
যেকোনো কারণেই হোক না কেন, শরীরে রোগ সৃষ্টির মূল অভ্যন্তরীণ কারণ হলো "মন্দাগ্নি" (হজম শক্তি দুর্বল হওয়া)।
যখন
জঠরাগ্নি দুর্বল হয়ে যায়, তখন আমাদের খাওয়া খাবার পুরোপুরি হজম হতে পারে না। এই আধো-হজম হওয়া খাবার
পাকস্থলীতে জমে এক প্রকার আঠালো, দুর্গন্ধযুক্ত এবং বিষাক্ত তরল তৈরি করে, যাকে আয়ুর্বেদে 'আম' (Ama) বলা হয়।
এই 'আম' বা টক্সিন রক্তের মাধ্যমে সারা
শরীরে ছড়িয়ে পড়ে এবং শরীরের সূক্ষ্ম চ্যানেল বা স্রোতগুলোকে (Channels) অবরুদ্ধ করে দেয়। যেখানে এই
টক্সিন জমা হয়, শরীরের
সেই অংশেই রোগ বা ব্যথার সৃষ্টি হয় (যেমন—গাঁটে জমা হলে বাতের ব্যথা, রক্তনালীতে জমা হলে কোলেস্টেরল
বা ব্লকেজ)।
৪.
ব্যাধির প্রকারভেদ (Classification of Diseases)
উৎস
এবং প্রকৃতি অনুযায়ী রোগকে প্রধানত তিনটি ভাগে ভাগ করা যায়:
1.
আধ্যাত্মিক রোগ: যা মানুষের ভেতরের উপাদানের কারণে হয়। এর মধ্যে
রয়েছে বংশগত রোগ (Genetic), গর্ভকালীন ভুল ত্রুটির কারণে হওয়া রোগ এবং জন্মগত রোগ।
2.
আধিভৌতিক রোগ: বাইরের কোনো আঘাত, দুর্ঘটনা, বা হিংস্র পশুপাখির কামড়ের কারণে যে রোগ বা জখম হয়।
3.
আধিদৈবিক রোগ: যা প্রকৃতির অদৃশ্য শক্তির প্রভাবে হয়। যেমন—ঋতু
পরিবর্তনের রোগ, ছোঁয়াচে
রোগ বা মহামারী (Epidemics), এবং বার্ধক্যজনিত স্বাভাবিক রোগ (যেমন দৃষ্টিশক্তি কমে
যাওয়া বা চুল পেকে যাওয়া)।
৫.
মানসিক রোগ ও তার কারণ (Mental Diseases)
শরীরের
মতো মনেরও রোগ হয়। শরীরের রোগ যেমন বাত, পিত্ত, কফের ভারসাম্যহীনতায় হয়, মনের রোগ তেমনি মনের দুটি দোষ—রজঃ এবং তমঃ গুণের আধিক্যের কারণে হয়।
- মানসিক রোগের কারণ:
অতিরিক্ত
লোভ,
মোহ, ক্রোধ, ঈর্ষা, শোক, ভয় এবং মানসিক চাপ। এগুলো
দীর্ঘস্থায়ী হলে তা পরবর্তীতে শারীরিক রোগেও (Psychosomatic
disorders) রূপান্তরিত হয়।
আয়ুর্বেদের
মূল সমাধান:
রোগ
থেকে দূরে থাকার উপায় হলো—নিজের প্রকৃতি ও ঋতু অনুযায়ী আহার (সঠিক খাদ্য), বিহার (সঠিক জীবনযাত্রা ও ঘুম) এবং ঔষধ বা ভেষজের মাধ্যমে শরীরের
অগ্নিকে সচল রাখা এবং তিন দোষের সাম্যাবস্থা বজায় রাখা।
0 Comments