আয়ুর্বেদ ও ভারতীয় দর্শন (বিশেষ করে বৈশেষিক দর্শন) অনুযায়ী, এই মহাবিশ্বের চিকিৎসা এবং সুস্থতার মূল ভিত্তি হলো "দ্রব্য" এবং "গুণ"আয়ুর্বেদের মূল উদ্দেশ্য—ধাতুর সাম্যাবস্থা বজায় রাখা বা রোগ নিরাময় করা—তা সম্পূর্ণভাবে বিভিন্ন দ্রব্যের সঠিক প্রয়োগ এবং তাদের গুণের ওপর নির্ভর করে।

নিচে দ্রব্য এবং দ্রব্যের গুণের স্বরূপ ও কার্যাবলী বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. দ্রব্য (Substance) — স্বরূপ ও প্রকারভেদ

দ্রব্যের সংজ্ঞা:

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে বলা হয়েছে—"যত্রাশ্রিতাঃ কর্মগুণাঃ কারণং সমবায়ী যৎ। তদ্ দ্রব্যম্॥" (চরক সংহিতা)

অর্থাৎ, যার মধ্যে গুণ (Properties) এবং কর্ম (Actions) সমবায়ী বা অবিচ্ছেদ্য সম্বন্ধে অবস্থান করে, তাকেই দ্রব্য বলা হয়। সহজ কথায়, দ্রব্য হলো সেই আধার বা বস্তু, যার মাধ্যমে গুণ ও কর্ম শরীরে প্রকাশ পায়। যেমন: 'ঘি' একটি দ্রব্য, আর তার গুণ হলো 'শীতল' 'স্নিগ্ধ'

দ্রব্যের প্রকারভেদ (Classification of Dravya):

মহাবিশ্বের সমস্ত দ্রব্যই মূলত পঞ্চভূত (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম) দ্বারা গঠিত। কার্যভেদে দ্রব্যকে প্রধানত দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

1.    কারণ দ্রব্য (Causal Substances) — ৯টি: যা থেকে সমস্ত সৃষ্টি উৎপন্ন হয়। এগুলো হলো: আকাশ, বায়ু, অগ্নি, জল, পৃথিবী, কাল (সময়), দিগ (দিক), আত্মা এবং মন

2.    কার্য দ্রব্য (Effect Substances): কারণ দ্রব্যগুলোর মিলনে যা কিছু আমরা দেখতে বা ব্যবহার করতে পারি (যেমন- গাছপালা, ওষুধ, ধাতু ইত্যাদি)। কার্য দ্রব্য আবার দুই প্রকার:

o   চেতন দ্রব্য: যার মধ্যে জীবন বা চেতনা আছে (যেমন- মানুষ, পশুপক্ষী, গাছপালা)

o   অচেতন দ্রব্য: যার মধ্যে চেতনা নেই (যেমন- সোনা, রূপা, পাথর, খনিজ পদার্থ)

২. গুণের স্বরূপ ও পরিচয় (Attributes/Properties)

গুণের সংজ্ঞা:

"সমবায়ী তু নিশ্চেষ্টঃ কারণং গুণঃ॥"

যা দ্রব্যের মধ্যে অবিচ্ছেদ্যভাবে (সমবায়ী সম্বন্ধে) থাকে, যার নিজস্ব কোনো সক্রিয় গতিবিধি বা চেষ্টা (Actionless) নেই, এবং যা কোনো কাজের পেছনে কারণ হিসেবে কাজ করে, তাকে গুণ বলে। গুণ নিজে একা থাকতে পারে না, তা সবসময় কোনো না কোনো দ্রব্যের আশ্রয় নিয়ে থাকে

গুণের সংখ্যা:

আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে (বিশেষ করে চরক সংহিতায়) মোট ৪১টি গুণের উল্লেখ পাওয়া যায়। এদের ৪টি মূল ভাগে ভাগ করা হয়েছে:

1.    সার্থক গুণ (Sensory Tastes) — ৫টি: আমাদের ৫টি জ্ঞানেন্দ্রিয় যা অনুভব করে (শব্দ, স্পর্শ, রূপ, রস, গন্ধ)

2.    গুরুয়াদি গুণ (Physical/Biomedical Properties) — ২০টি: আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় এই ২০টি গুণ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ

3.    পরাদি গুণ (Psychological/Therapeutic Properties) — ১০টি: চিকিৎসা পরিকল্পনার জন্য ব্যবহৃত গুণ (যেমন- পরত্ব, অপরত্ব, যুক্তি, সংখ্যা, সংযোগ, বিভাগ ইত্যাদি)

4.    আত্মা গুণ (Psychic Properties) — ৬টি: মনের বা আত্মার গুণ (ইচ্ছা, দ্বেষ, সুখ, দুঃখ, প্রবৃত্তি, বুদ্ধি)

৩. গুরুয়াদি ২০টি গুণ এবং শরীরের ওপর তাদের কার্য (The 20 Gurvadi Guhas)

এই ২০টি গুণ মূলত ১০টি জোড়ায় (Opposite Pairs) বিভক্ত। একটি গুণ বাড়লে তার বিপরীত গুণটি দিয়ে তাকে শান্ত করতে হয়—এটিই আয়ুর্বেদ চিকিৎসার মূল নিয়ম

ক্রম

গুণের নাম (পজিটিভ)

শরীরে এর কার্য ও রূপ

বিপরীত গুণ

শরীরে এর কার্য ও রূপ

গুরু (Heavy)

শরীর বৃদ্ধি করে, কফ বাড়ায়, হজম হতে সময় নেয়

লঘু (Light)

হজমে সহজ, শরীর হালকা করে, বাত বাড়ায়

শীত (Cold)

শরীর ঠান্ডা করে, পিত্ত শান্ত করে, রক্তপাত বন্ধ করে

উষ্ণ (Hot)

শরীরে তাপ বাড়ায়, হজম শক্তি বাড়ায়, পিত্ত বাড়ায়

স্নিগ্ধ (Oily)

আর্দ্রতা আনে, শরীরকে নরম করে, বাত শান্ত করে

রুক্ষ (Dry)

শুষ্কতা আনে, মেদ বা কফ কমায়, বাত বাড়ায়

মন্দ (Slow)

ধীরগতিতে কাজ করে, শরীরকে শান্ত বা শিথিল করে

তীক্ষ্ণ (Sharp)

দ্রুত কাজ করে, পিত্ত বাড়ায়, শরীরের গভীরে ঢোকে

স্থির (Stable)

শরীরের ধাতু ও অঙ্গকে দৃঢ় করে, স্থায়িত্ব দেয়

সর/চল (Mobile)

গতি বাড়ায়, মল ও বাতের চলাচল সচল করে

মৃদু (Soft)

পেশী ও ত্বককে নরম করে, জ্বালা-পোড়া কমায়

কঠিন (Hard)

শরীরে দৃঢ়তা বা কাঠিন্য আনে (যেমন- হাড়)

বিশদ (Clear)

শরীরের আঠালো ভাব দূর করে, চ্যানেল পরিষ্কার করে

পিচ্ছিল (Slimy)

আর্দ্রতা ও পিচ্ছিল ভাব বাড়ায়, হাড়ের জোড় রক্ষা করে

শ্লক্ষ্ণ (Smooth)

ক্ষত নিরাময় করে, ত্বক মসৃণ করে

খর (Rough)

খসখসে ভাব আনে, অতিরিক্ত ধাতু ক্ষয় করে

সূক্ষ্ম (Subtle)

শরীরের ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কোষে বা স্রোতে প্রবেশ করে

স্থূল (Gross)

স্থূলতা বাড়ায়, স্রোত বা চ্যানেলকে অবরুদ্ধ করে

১০

দ্রব (Liquid)

শরীরে তরল উপাদান (যেমন- রক্ত, লসিকা) বাড়ায়

সান্দ্র (Dense)

তরলকে ঘন করে, ধাতুর পুষ্টি সাধন করে

৪. চিকিৎসায় দ্রব্য ও গুণের ব্যবহারিক প্রয়োগ (Therapeutic Importance)

আয়ুর্বেদের মূল চিকিৎসা নীতি হলো: "সর্বদা সর্বভাবানাং সামান্যং বৃদ্ধিকারণম্। হ্রাসহেতুবিশেষশ্চ..."

অর্থাৎ, সমগুণ সম্পন্ন দ্রব্য শরীরে সেই গুণকে বাড়িয়ে দেয়, আর বিপরীত গুণ সম্পন্ন দ্রব্য তাকে কমিয়ে দেয়

  • উদাহরণ ১ (বাতের চিকিৎসা): বাতের প্রধান গুণ হলো রুক্ষ, শীত লঘুতাই বাতজনিত রোগে (যেমন জয়েন্টে ব্যথা) আয়ুর্বেদ চিকিৎসকরা এমন দ্রব্য ব্যবহার করেন যার গুণ স্নিগ্ধ, উষ্ণ এবং গুরু (যেমন—হালকা গরম তিলের তেল দিয়ে মালিশ করা)
  • উদাহরণ ২ (কফের চিকিৎসা): বুকে কফ জমলে তার গুণ হয় গুরু, শীত পিচ্ছিলএটি শান্ত করতে চিকিৎসকরা লঘু, উষ্ণ এবং তীক্ষ্ণ গুণসম্পন্ন দ্রব্য প্রয়োগ করেন (যেমন—মধু, আদা বা গোলমরিচ)

উপসংহার:

দ্রব্য হলো বাহক আর গুণ হলো তার ভেতরের শক্তি। চিকিৎসাক্ষেত্রে কোনো ভেষজ বা ওষুধ নির্বাচন করার সময় আয়ুর্বেদ বিশেষজ্ঞরা সেই দ্রব্যের ভেতরের এই সূক্ষ্ম গুণগুলোর বিচার করেই রোগীর শরীরে প্রয়োগ করেন, যাতে শরীরের তিন দোষের ভারসাম্য পুনরুদ্ধার করা সম্ভব হয়