আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে 'ধাতু' (Dhatu) বলতে শরীরের সেইসব মৌলিক উপাদান বা কলাকে (Tissues) বোঝায়, যা আমাদের পুরো শরীরকে ধারণ, পোষণ এবং এর কাঠামো গঠন করে।
'ধাতু' শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত 'ধা' মূল থেকে, যার অর্থ হলো "যা ধারণ করে বা পুষ্টি
জোগায়" (ধারণাদ্ ধাতবঃ)। তিন দোষ (বাত, পিত্ত, কফ) যদি শরীরের চালিকাশক্তি হয়,
তবে ধাতু হলো শরীরের সেই বাস্তব কাঠামো যাকে এই
শক্তিগুলো পরিচালনা করে।
আয়ুর্বেদ অনুযায়ী শরীরে প্রধানত ৭টি ধাতু রয়েছে, যাদের একত্রে "সপ্তধাতু" বলা হয়। নিচে এদের নিদ্দেশ ও বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া হলো:
১. সপ্তধাতুর পরিচয় ও
সুনির্দিষ্ট কার্য (The Seven Dhatus)
আমরা যে খাবার খাই, তা জঠরাগ্নির মাধ্যমে হজম হয়ে প্রথমে 'আহার রস' তৈরি করে। এরপর একটি নির্দিষ্ট
ক্রমানুসারে (চেইন রিঅ্যাকশনের মতো) একটি ধাতু থেকে পরবর্তী ধাতুর সৃষ্টি ও পুষ্টি
হয়।
১. রস ধাতু (Plasma /
Lymph)
- স্বরূপ: এটি খাবারের হজম
প্রক্রিয়ার পর তৈরি হওয়া প্রথম তরল বা পুষ্টিরস। মডার্ন সায়েন্সে একে
প্লাজমা বা লসিকা বলা যায়।
- প্রধান কাজ: প্রীণনম্ (Preenanam
- তৃপ্তি ও পোষণ): সারা শরীরের প্রতিটি কোষে
পুষ্টি উপাদান ও আর্দ্রতা পৌঁছে দিয়ে শরীরকে তৃপ্ত রাখা এর কাজ।
২. রক্ত ধাতু (Blood
Cells)
- স্বরূপ: রস ধাতু যখন যকৃৎ (Liver)
এবং প্লীহার (Spleen)
রঞ্জক পিত্ত দ্বারা লাল রঙ
ধারণ করে, তখন তা রক্ত ধাতুতে পরিণত
হয়।
- প্রধান কাজ: জীবনম্ (Jeevanam -
জীবনদান): শরীরে অক্সিজেন ও
প্রাণশক্তি সঞ্চালিত করে প্রতিটি অঙ্গকে সজীব ও সচল রাখা।
৩. মাংস ধাতু (Muscle
Tissue)
- স্বরূপ: রক্ত ধাতুর ওপর মাংসাগ্নির
পরিপাকের ফলে এই ধাতুর সৃষ্টি হয়। এটি শরীরের পেশীতন্ত্র।
- প্রধান কাজ: লেপনম্ (Lepanam - আবরণ): হাড় বা কঙ্কালতন্ত্রকে
ঢেকে রাখা, অঙ্গগুলোকে সুরক্ষা দেওয়া
এবং শরীরকে শারীরিক শক্তি ও নড়াচড়ার ক্ষমতা প্রদান করা।
4. মেদ ধাতু (Adipose / Fat
Tissue)
- স্বরূপ: মাংস ধাতুর পুষ্টির পর
তৈরি হওয়া চর্বি বা স্নেহ জাতীয় উপাদান।
- প্রধান কাজ: স্নেহনম্ (Snehanam
- তৈলাক্তকরণ ও সুরক্ষা): শরীরে আর্দ্রতা ও তৈলাক্ত
ভাব বজায় রাখা, ঘাম উৎপন্ন করা এবং শরীরের
তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ করা।
৫. অস্থি ধাতু (Bone
Tissue)
- স্বরূপ: মেদ ধাতুর কঠিন রূপান্তরের
মাধ্যমে হাড় ও তরুণাস্থি (Cartilage) তৈরি হয়। এটি আমাদের কঙ্কালতন্ত্র।
- প্রধান কাজ: ধারণম্ (Dharanam -
ধারণ বা সাপোর্ট): শরীরের মূল কাঠামো খাড়া
রাখা, ভেতরের নরম অঙ্গগুলোকে
রক্ষা করা এবং মাংস পেশীকে যুক্ত হতে সাহায্য করা।
৬. মজ্জা ধাতু (Bone
Marrow / Nervous Tissue)
- স্বরূপ: এটি হাড়ের ভেতরের ফাঁকা
অংশে থাকা নরম উপাদান (Bone Marrow) এবং স্নায়ুতন্ত্রের সাথে সম্পর্কিত।
- প্রধান কাজ: পূরণম্ (Pooranam -
পূর্ণ করা): হাড়ের ভেতরের শূন্যতা পূরণ
করা, রক্তকণিকা তৈরিতে সাহায্য
করা এবং স্নায়ুর বার্তা আদান-প্রদান সচল রাখা।
৭. শুক্র ধাতু (Reproductive
Tissue)
- স্বরূপ: এটি সপ্তধাতুর সর্বশেষ ও
সূক্ষ্মতম রূপ। পুরুষদের ক্ষেত্রে শুক্রাণু এবং নারীদের ক্ষেত্রে ডিম্বাণু ও
আর্দ্রব এর অন্তর্ভুক্ত।
- প্রধান কাজ: গর্ভ উৎপাদন (Garbhautpadanam
- প্রজনন): নতুন প্রাণের সৃষ্টি করা
এবং শরীরে ওজস বা পরম জীবনীশক্তি প্রদান করা।
২. ধাতু পুষ্টির ক্রমান্বয় (Krama
of Dhatu Poshan)
আয়ুর্বেদ অনুযায়ী, একটি ধাতু থেকে আরেকটি ধাতু তৈরি হতে একটি সুনির্দিষ্ট সময় ও রূপান্তর
প্রক্রিয়ার প্রয়োজন হয়। উদাহরণস্বরূপ:
$$\text{আহার রস} \rightarrow
\text{রস} \rightarrow \text{রক্ত} \rightarrow \text{মাংস} \rightarrow
\text{মেদ} \rightarrow \text{অস্থি} \rightarrow \text{মজ্জা}
\rightarrow \text{শুক্র}$$
প্রতিটি ধাতুর নিজস্ব একটি
অগ্নি থাকে (যাকে ধাত্বগ্নি বলে)। এই অগ্নি যদি দুর্বল হয়ে যায়, তবে সেই নির্দিষ্ট ধাতু এবং তার পরবর্তী ধাতুগুলোর পুষ্টি ব্যাহত হয়।
৩. ধাতুর ক্ষয় ও বৃদ্ধির লক্ষণ
- ধাতু ক্ষয় (Dhatu
Kshaya): কোনো ধাতু স্বাভাবিকের
চেয়ে কমে গেলে শরীরে দুর্বলতা দেখা দেয়। যেমন—রক্ত ক্ষয়ে ফ্যাকাসে ভাব বা
অ্যানিমিয়া হয়, অস্থি ক্ষয়ে হাড় ও জয়েন্টে
ব্যথা বা অস্টিওপোরোসিস হয়।
- ধাতু বৃদ্ধি (Dhatu
Vriddhi): কোনো ধাতু অতিরিক্ত বেড়ে
গেলে তা শরীরে অস্বাভাবিকতা তৈরি করে। যেমন—মেদ ধাতু অতিরিক্ত বাড়লে ওবেসিটি
বা স্থূলতা এবং চর্বির চাকা তৈরি হয়।
৪. ওজস: সপ্তধাতুর পরম নির্যাস
(Ojas)
যখন এই সাতটি ধাতু শরীরে একদম
নিখুঁত এবং ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থায় থাকে, তখন শুক্র ধাতুর পরিপাকের পর এক পরম তেজ বা শক্তির সৃষ্টি হয়, যাকে আয়ুর্বেদে 'ওজস' (Ojas) বলা হয়। এই ওজসই হলো মানুষের
আসল রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immunity), চেহারার ভেতরের
উজ্জ্বলতা (Glow) এবং দীর্ঘায়ুর চাবিকাঠি।
তাই শরীরকে রোগমুক্ত ও বলবান
রাখতে এই সপ্তধাতুর সঠিক পুষ্টি ও ভারসাম্য বজায় রাখা অত্যন্ত আবশ্যক।
0 Comments