আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে দোষের ভারসাম্য কেবল শরীরের ভেতরের উপাদানের ওপর নির্ভর করে না, তা বাইরের প্রকৃতির পরিবর্তনের সাথেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। একেই "দোষের প্রকোপকাল" বলা হয়।


প্রকৃতিতে দোষের মূলত তিনটি দশা বা পর্যায় থাকে:

  1. সঞ্চয় (Accumulation): দোষ ধীরে ধীরে শরীরে জমতে শুরু করে (লক্ষণ মৃদু থাকে)
  2. প্রকোপ (Aggravation/Vitiation): দোষ চরম সীমায় পৌঁছায় এবং এই সময়েই রোগ ব্যাধি দেখা দেয়
  3. শমন (Pacification): দোষ স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে

ঋতু পরিবর্তন, দিনের বিভিন্ন সময় এবং খাদ্য হজমের পর্যায় ভেদে দোষের প্রকোপকাল নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:

১. ঋতু অনুসারে দোষের প্রকোপকাল (Seasonal Timing)

ভারতের প্রচলিত ছয়টি ঋতু এবং আবহাওয়া পরিবর্তনের সাথে দোষের প্রকোপকাল নিচে ছকের মাধ্যমে দেখানো হলো:

দোষ

সঞ্চয় কাল (জমা হয়)

প্রকোপ কাল (বৃদ্ধি পায়/রোগ ছড়ায়)

শমন কাল (শান্ত হয়)

বাত

গ্রীষ্মকাল (শুকনো গরমে শরীর রুক্ষ হয়)

বর্ষাকাল (মেঘলা ও ঠান্ডা আবহাওয়ায় বাত বাড়ে)

শরৎকাল (হালকা গরমে শান্ত হয়)

পিত্ত

বর্ষাকাল (অ্যাসিডিক জল ও আর্দ্রতায় পিত্ত জমে)

শরৎকাল (কড়া রোদে পিত্ত চরম রূপ নেয়)

হেমন্তকাল (ঠান্ডা পড়তে শুরু করলে শান্ত হয়)

কফ

শীত ও হেমন্তকাল (ঠান্ডায় কফ শরীরে জমাট বাঁধে)

বসন্তকাল (সূর্যের তাপে জমাট কফ গলে প্রকোপ ছড়ায়)

গ্রীষ্মকাল (রুক্ষ গরমে কফ শুকিয়ে শান্ত হয়)

বিশেষ দ্রষ্টব্য: বসন্তকালে সর্দি-কাশি, শরৎকালে পেটের সমস্যা বা লিভারের সমস্যা এবং বর্ষাকালে জয়েন্টে ব্যথা বা বাতের সমস্যা বাড়ার মূল কারণ এই ঋতুভিত্তিক প্রকোপকাল

২. দিন ও রাতের সময় অনুসারে প্রকোপকাল (Diurnal Timing)

২৪ ঘণ্টার দিন ও রাতকে আয়ুর্বেদে ৪ ঘণ্টা করে কয়েকটি ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেখানে নির্দিষ্ট দোষের প্রভাব বাড়ে:

দিনের বেলা:

  • সকাল ৬টা – সকাল ১০টা (কফ কাল): এই সময় শরীর ও প্রকৃতি ভারী এবং শান্ত থাকে। তাই সকালে অলসতা বেশি লাগে
  • সকাল ১০টা – দুপুর ২টা (পিত্ত কাল): এই সময় সূর্য মাথার ওপর থাকে, ফলে জঠরাগ্নি বা হজম শক্তি সবচেয়ে তীব্র হয়। এই সময় দুপুরের প্রধান খাবার খাওয়া উচিত
  • দুপুর ২টা – বিকেল ৬টা (বাত কাল): এই সময় শরীরে হালকা ভাব আসে এবং শক্তি ও গতিশীলতা বাড়ে

রাতের বেলা:

  • বিকেল ৬টা – রাত ১০টা (কফ কাল): শরীর আবার ভারী হতে শুরু করে এবং ঘুমের ভাব আসে
  • রাত ১০টা – রাত ২টা (পিত্ত কাল): এই সময় শরীর ভেতরের অঙ্গগুলো মেরামত (Detoxification) করে। এই সময়ে জেগে থাকলে লিভারের ক্ষতি হয় এবং খিদে পেয়ে যায়
  • রাত ২টা – সকাল ৬টা (বাত কাল): এই সময় শরীর থেকে মল-মূত্র নিষ্কাশনের বেগ আসে। সকাল ৫টার দিকে উঠলে মন সবচেয়ে সতেজ থাকে (ব্রহ্মমুহূর্ত)

৩. খাদ্য পরিপাক বা হজমের পর্যায় অনুসারে (Digestive Timing)

আমরা খাবার খাওয়ার পর তা হজম হওয়ার বিভিন্ন ধাপেও দোষের প্রকোপ বা আধিক্য দেখা যায়:

  • ভোজনের প্রথমাংশ (কফ কাল): খাবার খাওয়ার ঠিক পরপরই পাকস্থলীতে মিষ্টি রস তৈরি হয় এবং কফ বৃদ্ধি পায়। তাই খাওয়ার পর একটু অলস বা ভারী লাগে
  • ভোজনের মধ্যাংশ (পিত্ত কাল): খাবার যখন পাকস্থলী থেকে ক্ষুদ্রান্ত্রে যায়, তখন অম্ল বা অ্যাসিড মিশ্রিত হয়ে পিত্তের কাজ শুরু হয়। এই সময় শরীরে তাপ বাড়ে
  • ভোজনের শেষাংশ (বাত কাল): খাবার পুরোপুরি হজম হয়ে যখন বৃহদন্ত্রে পৌঁছায়, তখন তা শুকনো হয়ে মল ও গ্যাসে রূপান্তরিত হতে শুরু করে। এই শেষ পর্যায়ে বাত দোষের আধিক্য ঘটে