আয়ুর্বেদ শাস্ত্রে 'রোগের অধিষ্ঠান' বলতে বোঝায় শরীরের সেই সুনির্দিষ্ট স্থান, আধার বা অঙ্গ যেখানে কোনো রোগ বা ব্যাধি উৎপন্ন হয় এবং আশ্রয় নিয়ে প্রকাশ পায়।
সহজ
কথায়,
রোগ সৃষ্টির জন্য
দূষিত দোষগুলো শরীরের যে অংশে গিয়ে জমা হয় এবং ধাতুকে দূষিত করে, সেই স্থানটিই হলো ওই রোগের
অধিষ্ঠান বা বাসস্থান (অধিষ্ঠানং রোগাণাম্)।
নিচে
রোগের অধিষ্ঠানের মূল বিভাজন এবং এর গুরুত্ব বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
১.
রোগের প্রধান দুটি অধিষ্ঠান (Two Primary Seats of Disease)
ঋষি
চরক সংহিতায় স্পষ্ট উল্লেখ করেছেন যে, মানবদেহে রোগ মূলত দুটি প্রধান আশ্রয় বা ক্ষেত্রে
প্রকাশ পেতে পারে:
ক)
শরীর বা কায়া (Soma/Physical Body):
এটি
হলো আমাদের স্থূল বা দৃশ্যমান শরীর। পঞ্চভূত এবং সপ্তধাতু দিয়ে তৈরি এই শরীরে যখন
বাত,
পিত্ত বা কফের
ভারসাম্য নষ্ট হয়, তখন তাকে শারীরিক রোগের অধিষ্ঠান বলা হয়।
- উদাহরণ:
জ্বর, জণ্ডিস, কুষ্ঠ বা চর্মরোগ, পেটের অসুখ, হাড়ের ক্ষয় বা বাতের
ব্যথা।
খ)
মন বা চিত্ত (Psyche/Mind):
এটি
মানুষের সূক্ষ্ম বা মানসিক ক্ষেত্র। মনের দুটি দোষ—রজঃ এবং তমঃ গুণের ভারসাম্য বিগড়ে গেলে মন
রোগের অধিষ্ঠানে পরিণত হয়।
- উদাহরণ:
অতিরিক্ত
কাম,
ক্রোধ, লোভ, মোহ, বিষণ্ণতা (Depression)
বা
উন্মাদ রোগ।
বিশেষ
সংযোগ (Psychosomatic Relationship):
শরীর
ও মন একে অপরের সাথে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। তাই অনেক সময় রোগের অধিষ্ঠান মনে হলেও তা
পরবর্তীতে শরীরে প্রকাশ পায় (যেমন—অতিরিক্ত মানসিক দুশ্চিন্তা থেকে গ্যাস্ট্রিক বা
আলসার হওয়া)। আবার শারীরিক দীর্ঘস্থায়ী কষ্ট থেকেও মানসিক অবসাদ আসতে পারে।
২.
তন্ত্র বা স্রোত অনুসারে রোগের সুনির্দিষ্ট অধিষ্ঠান
শরীরের
ভেতরে রোগ কোন পথ বা চ্যানেলে অবস্থান করছে, তার ওপর ভিত্তি করে অধিষ্ঠানকে ৩টি প্রধান মার্গে
বা পথে ভাগ করা হয়। একে "রোগ মার্গ" বলা হয়:
১.
বাহ্য রোগ মার্গ (Outer Path - ত্বক ও রক্ত):
রোগের
অধিষ্ঠান যখন শরীরের বাইরের স্তরে বা কলায় থাকে।
- আশ্রয়স্থল:
ত্বক
(Skin)
এবং
রক্ত ধাতু।
- রোগের উদাহরণ:
বিভিন্ন
চর্মরোগ (একজিমা, সোরিয়াসিস), আঁচিল, ব্রণ, এবং অর্শ (Piles)।
২.
মধ্যম রোগ মার্গ (Middle Path - হাড় ও জয়েন্ট):
রোগের
অধিষ্ঠান যখন শরীরের ভেতরের গভীর বা কঠিন কলাগুলোতে হয়।
- আশ্রয়স্থল:
হাড়
(Bones),
মজ্জা
(Marrow),
হাড়ের
জোড় বা গাঁট (Joints), এবং হৃদপিণ্ড বা
মস্তিষ্কের মতো গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।
- রোগের উদাহরণ:
গাঁটে
বাত বা জয়েন্টে ব্যথা (Arthritis), পক্ষাঘাত বা প্যারালাইসিস
(Paralysis),
এবং
হাড়ের ক্ষয় রোগ।
৩.
অভ্যন্তরীণ রোগ মার্গ (Inner Path - কোষ্ঠ বা পরিপাকতন্ত্র):
রোগের
অধিষ্ঠান যখন আমাদের মহাকোষ্ঠ বা ভেতরের ফাঁকা গহ্বরে হয়।
- আশ্রয়স্থল:
পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদন্ত্র এবং ফুসফুস (Digestive
& Respiratory Tract)।
- রোগের উদাহরণ:
অম্বল
বা গ্যাস, বমি, কোষ্ঠকাঠিন্য, আমাশয়, কাশি, এবং হাঁপানি (Asthma)।
৩.
রোগ এবং অধিষ্ঠানের মিলন প্রক্রিয়া: 'খ-বৈগুণ্য'
দূষিত
দোষগুলো শরীরে ঘুরে বেড়ানোর সময় তখনই রোগে রূপ নেয়, যখন তারা কোনো দুর্বল স্থানে গিয়ে আটকে যায়। এই
দুর্বল স্থানটিকে আয়ুর্বেদে বলা হয় "খ-বৈগুণ্য"
(Khavaigunya - চ্যানেলের
দুর্বলতা)।
- সহজ উদাহরণ:
কোনো
ব্যক্তির যদি বংশগত বা অন্য কোনো কারণে ফুসফুস বা শ্বাসতন্ত্র দুর্বল থাকে
(সেটিই তার খ-বৈগুণ্য), তবে তার শরীরে কফ বা বাত দূষিত হলে তা সোজা গিয়ে
ফুসফুসে জমা হবে। এক্ষেত্রে ফুসফুস বা বুক হবে সেই রোগের সুনির্দিষ্ট
অধিষ্ঠান, যার ফলে হাঁপানি বা কাশির
সৃষ্টি হবে।
কেন
এটি জানা জরুরি?
চিকিৎসা
বিজ্ঞানে রোগের নাম জানার চেয়ে রোগের অধিষ্ঠান এবং সেখানে কোন দোষ দূষিত হয়েছে তা
জানা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। রোগের অধিষ্ঠান যদি 'বাহ্য মার্গ' বা ত্বকে হয়, তবে তা সহজে নিরাময় করা যায়। কিন্তু অধিষ্ঠান যদি 'মধ্যম মার্গ' অর্থাৎ হাড় বা মজ্জায় হয়, তবে সেই রোগ সারানো তুলনামূলক
কঠিন ও সময়সাপেক্ষ হয়।
0 Comments